Header Ads

আজ বাংলা
ইংরেজি

রেহনুমার রক্তাশ্রু


   



'তুমি আজ ক'দিন ধরেই আমাকে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছো না। এভাবে স্কুল ফাঁকি দিতে থাকলে স্যারেরা আমায় বকবে না তো!'


মুখের সামনে নিয়ে আসা খাবারের লোকমাটা আর পুরে দেওয়া হলো না৷ কথাটা কানে পড়তেই তব্দা খেয়ে গেল রেহনুমা। অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকে প্রিয় ছোট ভাইটির নিষ্পাপ মুখে। মায়ের স্নেহ মমতা দিয়ে ভাইটিকে আগলে রেখেছে এতকাল। অনাদরের ধূসর রঙে মলিন হতে দেয় নি আদুরে ভাইটির মুখায়ব। নিজেই হাতে ধরে স্কুলে আনা-নেওয়া করত । এক মুহূর্তের জন্যও আড়াল হতে দিত না জোড়াচোখ থেকে। মায়ের অভাব কখনই বুঝতে দেয় নি স্বামীর বাড়ি পা না রাখা এই যুবতি বোনটি। কিন্তু আজ ভাইটির এমন কথায় সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো উত্তর নেই তার কাছে। মায়ের কথাও মনে পড়ে যায়।অমনি ঝাঁপসা হয়ে আসে চোখ দুটো। অশ্রুজলে চিকচিক করে ওঠে।  অব্যক্ত যন্ত্রণার কষ্টাশ্রুতে ভেসে বেড়ায় ধর্ষিতা মায়ের কাপড়-ছেঁড়া নগ্ন শরীর।  


বছর আট পূর্বে ঘটে যাওয়া গর্ভধারিণী মায়ের সেই বীভৎস দৃশ্য আজ অনর্গল অশ্রু ঝরাচ্ছে রেহনুমার চোখের পাড় ভেঙ্গে। ভারতীয় সংবিধান থেকে ৩৭০ ধারা মুছে ফেলার পর কাশ্মিরীদের হাজারও ভয়ানক চিত্র কুটকুট করে কাটছে তার যুবতি-মগজকে। সহসা সম্বিত ফিরে পেল ছোট ভাইয়ের হাতের কোমল স্পর্শে। 

--তুমি কাঁদছো? (ভাইয়ের জিজ্ঞাসা)

--না ভাই কাঁদছি না। এমনিই চোখে পানি চলে এলো।(চোখের পানি মুছতে মুছতে উত্তর দিল রেহনুমা)।

--আমরা একা একা খেতে বসেছি। ক'দিন ধরেই বাবা বাইরে। এখনও তো এলো না।

--আসবে আসবে আমার প্রিয় ভাই। হয়তো একটু দেরি হবে। কেননা, তিনি একটি মহান কাজে বেরিয়েছেন।

--কোন কাজে? 

--তুমি যে কারণে স্কুলে যেতে পারছ না। (খানিকটা স্বাভাবিক হয়ে উত্তর দিল রেহনুমা)।

সহসা চার কানে ভেসে এলো অস্পষ্ট সম্মিলিত ধ্বনি-----আজাদি! আজাদি!! আজাদি!!!


রেহনুমার অসহায় চোখ এখনও নিষ্পাপ ভাইয়ের মুখ থেকে সরে নি। মিছিল-ধ্বনিটা ক্রমশ বড় হতে থাকে। স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হতে থাকে একদল মুক্তিপাগল কাশ্মিরীর হৃদয়ের ডাক। যেন তারা খাঁচাবন্দি পাখি নয়। নীল আকাশে ডানা মেলা মুক্ত পাখি। রেহনুমাদের বাড়ির পাশ ঘেঁষে চলে যাওয়া রাস্তাটি ধরেই এগুচ্ছে মুক্তিমিছিল। জানলার পাশে দৌড়ে যায় ভাই-বোন। স্বাধীনচেতা নির্ভীক অগণিত মানুষের সাথে মিশে যায় চার চোখ। আজাদি শ্লোগানের সুরে সুর মিলিয়ে ঘরের ভেতরটাও মুখরিত করে তুলে ভাই-বোনের জোড়ামুখ। আশার পিদিম জ্বলে ওঠে রেহনুমার আঁধিয়ার প্রাণে। মুখায়বে জমে থাকা ধূসর মেঘখন্ডগুলো সরে যেতে থাকে এক এক করে। ঠোঁটের প্রান্তে ঝুলে থাকে এক অপার্থিব হাসি। এই প্রথম তার অনুভব হলো, হৃদয়ের নরম ভূমে চেপে বসা কষ্টের বিশালাকায় পাথর কে যেন ঠেলে ঠেলে সরিয়ে দিচ্ছে। অল্প পরেই মিছিল অনেকটা দূর এগিয়ে যায়। স্পষ্টভাবে এখনও শোনা যাচ্ছে মুক্তির বাণী আজাদি শ্লোগান। এমন একটা ভালো আন্দোলনে বাবাও আছেন, ভাবতেই রেহনুমার বুকটা গর্বে ভরে যায়। 


জানলা গলে বারবারই রাস্তায় ফিরে যাচ্ছে রেহনুমার জোড়াচোখ। আকাশটা ঘোলাটে। খন্ড খন্ড ধূসর মেঘ জমছে। হঠাৎ পাংশু বর্ণ ধারণ করে রেহনুমার এতক্ষণের উজ্জ্বল মুখটি। যেন আকাশের ধূসর মেঘগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে মুখায়বের চামড়ায় এসে জমছে।  অজানা আতংক ও ভয়ে থরথরিয়ে কাঁপছে পুরো দেহ। ছোট ভাইটিও বোনকে জড়িয়ে কাঁপছে। মুহুর্মুহু গুলির আওয়াজ কানের পাড়ে বিস্ফোরিত হচ্ছে জীবননাশা ভয়ঙ্কর বার্তা নিয়ে। রেহনুমার বুঝতে বাকি রইল না, এতক্ষণে রাক্ষুসে গুলি খেয়ে ফেলেছে অসংখ্য নির্দোষ তরতাজা প্রাণ। চোখের পলকেই ঘটে যাচ্ছে সব। সেনাদের হিংস্র নখের আঁচড়ে ক্ষত বিক্ষত কচি শিশু ও অবলা নারীদের হৃদয়বিদারক চিৎকার ভেসে আসছে পাশের বাড়িগুলো থেকে। রেহাই পাচ্ছে না কেউই। খানিক পর একদল সৈন্য বাঁধভাঙা স্রোতের মত হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে রেহনুমাদের ঘরেও। যুবতি রেহনুমার রূপ দেখে সেনাদের দ্বিগুণ চোখে জ্বলে ওঠে নিষিদ্ধ কামনার আগুন। অবলা নারীর ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে বিদ্রূপের অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। অনবরত কেঁদে কেঁদে ইজ্জত ভিখ চায় রেহনুমা। কিন্তু কে শুনে কার কথা? ক্ষুধার্ত হায়েনার মত ঝাঁপিয়ে পড়ে অসহায় মেয়েটির ওপর। হাজার মিনতিও গলাতে পারে নি ওদের পাষণ্ড হৃদয়। গায়ের কাপড় ছিঁড়ে ফেড়ে রেহনুমাকে টেনে হেঁচরিয়ে নিয়ে যেতে থাকে নরপশুরা। ছোট ভাইটি আপু আপু করে বোনের হাতটি ধরার ব্যর্থ চেষ্টা করে। তখনই গর্জে উঠে একটি সেনা-বন্দুক। মুহুর্তেই মেঝেয় গড়াগড়ি খায় ভাইয়ের রক্তাক্ত শরীর। বয়ে যায় রক্তের লাল স্রোত। সামান্য ব্যবধানে নিথর হয়ে পড়ে থাকে রক্তভেজা দেহটি। অমনি আকাশ পাতাল কেঁপে উঠে রেহনুমার গগণবিদারি চিৎকারে। অকল্পনীয় নির্মম বেদনাশ্রুর ঢল নামে চোখের পাড় ভেঙ্গে। শক্ত হাতের পাঁজাকোলা ছাড়িয়ে শেষ বারের জন্য প্রিয় ভাইকে ছুঁয়ে দেখার আপ্রাণ ব্যর্থ চেষ্টা চালায় মেয়েটি। রেহনুমা যতই চেষ্টা করে, ততই ওকে খামছে ধরে হায়েনাদের হিংস্র হাত। ধীরে ধীরে রেহনুমার অশ্রুভেজা চোখ থেকে অস্পষ্ট ও অদৃশ্য হতে থাকে মায়ের আদর দিয়ে বড় করে তোলা একমাত্র ভাইটির রক্তাক্ত লাশ!

লেখেছেন, কাউসার আহমাদ

বিভাগীয় সম্পাদক- দ্যা সুন্নাহ বিডি

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.